ফেনীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ে একটি লেখা হটাৎ আমার চোখে পড়ে।
পঠিত অংশে ঐতিহাসিক রাজাঝির দিঘীর পাড়ের তৎকালীন ব্যস্ততার চিত্র এবং এই দিঘী কেন্দ্রিক শত মানুষের জীবিকার্জন এসবের বৃহৎ বিবরণ ছিল। সেটি পড়ে নিজের কৈশরের স্মৃতি রোমন্থনের অভিপ্রায় থেকে কিছুটা লেখা শুরু করি।
ফেনী শহরে আমার আগমনের সময়কাল ১৯৯৪ থেকে শুরু;
মনে পড়ে যায় মাস্টার পাড়ার জীবনযাপন, নির্মম ভাবে খুন হওয়া ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরাম ভাইদের বাসায় ভাড়া থাকতাম আমরা।
কানন সিনেমাহল কেন্দ্রিক মানুষের জমজমাট ব্যাবসাপাতি, গুরু চক্র মন্দিরের পুজার চিত্র, হাজারী (ভাইছা’র)পূবালীর রমরমা বৈশাখী মেলা, জেলখানার হাজতিদের সাথে দেখা করতে আসা আগত আত্নিয় স্বজনের হাকডাক, পথচারীদের গায়ে রুটি ছোড়াছুড়ি, কলেজ রোডের রাজনৈতিক জমায়েত, ৯৫-৯৬ এর দিকের কার্ফু, দাঙ্গা-হাঙ্গামার উত্তালতা।
পাইলট প্রাইমারি থেকেই বাল্যবন্ধু হয়ে টোপন,রঞ্জু,শৈবাল,পিপলু,রাজু,কপিল,সুজন,তনু, মহসিন,রিয়াদ-সুমন,মইনুল রাজিব, আলফাদের সাথে নানারকম খেলাধুলা, বিশেষ করে জুতা দিয়ে আশ্রয়ণ কেন্দ্রের ফ্লোরে ফুটবল খেলা, হনুফা ম্যাডামের হাতের লেখা, ক্লাস শেষে হেডমাস্টার সোলাইমান স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ার নামে বেঞ্চিতে ঘুম পাড়ানো, ওনার দৈত্যকায় দেহ টিপে দেয়া ছিল নৈমিত্তিক রুটিন! সেসব ভুলা যায়?
আমাদের পাইলট হাইস্কুল মাঠের জমজমাট গনি ফুটবল টূর্ণামেন্ট, নিজেদের টেনিস বলের বোম্বাস্টিং মানে একজন আরেকজনকে বল মেরে গায়ে লাগানো, টিফিনের ফাঁকে এসেম্বলি হলে ক্রিকেট খেলা, বৃস্টির দিনে মাঠে পানি জমে গেলে কয়েকজন মিলে পানিতে দৌড়যাপ করে স্কুল ড্রেস ভিজিয়ে ছুটির দরখাস্ত দিয়ে বাধ্যতামূলক ছুটি নেয়া, মাঠময় দাপিয়ে এসে শাহজাহান ভাইয়ের নারিকেল আইসক্রিম সাবাড় করা, মালেক ভাইয়ের চিনা বাদাম চেখে দেখা, জাহাংগীর মামার ছোলা বুট খাওয়ার আগে একাধিকবার ফ্রি স্যাম্পল নেয়া।
পাইলট হাইস্কুলের শীতল স্যারের ইস্পাত কঠিন ব্যাবহার, ওহাব স্যারের ডাস্টার থেরাপি, খায়েজ আহমেদ স্যারের লম্বা বেতের কথা, মনোরঞ্জন স্যারের নিজের লেখা গোল্ডেন চান্স (বিফলে মূল্য ফেরত গ্যারান্টি সহ), ধর্মীয় শিক্ষক খালেক স্যারের একমন ওজনের চড়ের কথা,জীবন স্যারের বাবারা ডাক, আওরঙ্গজেব স্যার টেবিলের নিচে মাথা ঢুকিয়ে
শরীরের পিছন অংশের ছাল আলগা করে দিতেন,
যা সহজে ভুলবার নয়।
সেই বয়সে গার্লস হাই স্কুলের মেয়েদের সাথে আমাদের অঘোষিত প্রতিযোগিতা লেগেই থাকতো। স্কুলের আশেপাশে আমাদের স্কুলের রোমিও বন্ধুদের ঘোরাঘুরি, নিজেকে হ্যান্ডসাম সাজানোর সেকি প্রাণান্ত চেস্টা!
কিছুদিনের বিরতি নিয়ে আমাদের সেকেন্ড বয় আবিরের নেতৃত্বে স্কুল ড্রেস নিয়েই দুলাল সিনেমা হল, সুরতমহলে কিংবা বিলাসীতে না গেলে চলতো-ই না আমাদের!
রাজাঝির দিঘীর পাড়ের হরেক রকমের যাদু দেখে তাজ্জব বনে যাওয়া, মোঘল সুইটস এর নাস্তা, মাঝে মধ্যে ১০/১২ টাকায় ডিম/ডাল দিয়ে এক প্লেট ভাত খেয়ে নেওয়া, শিক্ষা বিপনির চাচা চৌধুরী ও সাবুর বই পড়া, পেন্টম বই চুরি করা। অন্য বন্ধুরা অবশ্য সুযোগ পেলেই ভিডিও গেমস দোকানে ঢু মারতো।
উল্লেখ না করলেই নয়, আমরা সাত ভাইয়ের সর্বাপেক্ষা বড়জনের অভিভাবকত্বে বড় হয়েছি আমি আর আমার পিঠাপিঠি বড়ভাই। বাবা-মা গ্রামের বাড়ি পূর্ব শিলুয়াতে বড়সড় গৃহস্থালির ধকল সামলাতেন।
বড়ভাইকে আমরা দাদা ডাকতাম উনি সরকারী চাকুরীজীবী।
৯৫ সালের শেষে দাদা বাসা একাডেমীর বনানী পাড়ায় নিজের জায়গায় স্থানান্তর করেন।
বাচ্ছাদের পড়াশোনার সুবিধার্থে ৯৭ এর শেষে আবার চলে আসেন সুফি সদর উদ্দিন রোডে!
এবার আরেক গল্প শুরু হয় এখানে,
এসেই নতুন বন্ধু যোগাড় করা, শিপলু, আসিফ,উপল, রিয়াদ সুমন,রাজিব,ফরহাদ,নিরব,মাছুম,পরাগ,শিমুল, রনি, পিকলুরা তখন নিত্য সহচর।
বড়ভাইদের মধ্যে শুভ ভাই,মজনু ভাই,আরিফ ভাই, হাফিজ ভাই, বাবর ভাই, জয়নাল ভাই, শান্ত ভাই, সুমির ভাইদের সাথে পাল্লা দিয়ে মাঠে নিয়মিত হতাম, এবং জুনিয়রদের মধ্যে সানি সেইরকম ব্যাটিং করতো ক্রিজে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে পারতো, তাকে বোলিং করে বোলাররা রীতিমতো বিরক্ত হয়ে যেত!আমাদের কাউসারের বাঁহাতি বল ফেস করতে বেগ পেতে হতো কমবেশি সকলের। পুলক,রাফি,রাহিম, আদনান, পায়েলরা দলে ভূমিকা রাখতে শুরু করে তখন। আরিফ, জুয়েলরা খেলার স্পিরিট সঞ্চয় করছে সবে।
খেলাধুলার স্থান কুদ্দুস মিয়ার পেট্রল পাম্প সংলগ্ন মাঠ,সুফি
সদর উদ্দিন রোডের তিন রাস্তার মোড়ের খালি জায়গায় এবং মিজান রোডের আলিয়া মাঠে সকাল বিকাল যাতায়াত অবধারিত ছিল।
এ সময়ে মন মানসিকতায় সবচেয়ে বেশি মিলে যায় বন্ধু রিয়াদ সুমনের সাথে। একজন আরেকজনের যেকোন অব্যক্ত কথা শেয়ার করতাম অকপটে।
ডাক্তার পাড়ায় গিয়ে হুটহাট আড্ডামুখর সময় কাটিয়ে আসতাম শাওন, ইকবাল, পাভেল, সাজিদ, কিরণ,মাছুম, মোর্শেদ, নোহেল ও রাজু ভাইদের সাথে।
একটা সময় বিকেল করে বনানী পাড়ায় আকাশ, জিসান, রাসেল, বড়বাড়ির রাজু, মঞ্জুর, কাকলী রাজিব, সোহেল সহ কখনো গাজী ক্রস রোডের সোলেমানের দোকান,নয়তো বিলোনিয়াগামী রেল লাইনের উপর বিরতিহীন খুনসুটি, অলস সময়পার ছিল অহরহ।
জেলার বিভিন্ন জায়গায় টেম্পু ভাড়া করে ক্রিকেট খেলতে যাওয়া দিনগুলোর মজমা কেমন হতে পারে বলতে গেলে মোটামুটি দিনকয়েক পার হবেই!
পাড়ায় দস্যিপনায় নেতৃত্ব দানে, এবং ধীরে ধীরে রাজনীতির ঝালে জড়ানোর গল্প না হয় আজ থাক।
আপাতত আর না,
কিছুটা কৈশরের উচ্ছলতা পেয়ে বসেছে আজ।
বাকিটা না হয় আরেকদিন যোগ করবো।
ভালো থাকুক প্রিয় ফেনী, নির্মল আনন্দে কাটুক সংস্কৃতি মনা সকলের প্রতিটি সোনালী ভোর।
সাইফুল ইসলাম খাঁন।
এস এস সি ব্যাচ ২০০০।

Leave a Reply