যুদ্ধের ময়দানে তাঁকে ডাকা হতো “রিয়েল টাইগার” সম্বোধন করে। বিখ্যাত কামালপুর যুদ্ধের মহানায়ক! যে কামালপুর যুদ্ধের পাঠদান করা হয় বিশ্বখ্যাত সব ডিফেন্স কলেজে।

শামসুদ্দিন আহমেদ আর খায়রুন নাহারের বড় আদরের সালাউদ্দিন। শেষের নামটি দাদার দেয়ার। দাদা স্বপ্নে দেখেছিলেন নাতি হবে। তাই নাম দিলেন মমতাজ। মমতাজ অর্থ সর্বোৎকৃষ্ট। মোটে মিলে সালাউদ্দিন মমতাজ।
তাঁর দাদা ছিলেন আকিয়াবের শেষ মুসলিম জমিদার। আর নানা ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য।
অতিথিতে নিত্য ভর্তি বাড়ি। মা দুহাতে সামলাচ্ছেন বাড়ির প্রতিটি দিক। কাজের লোকেরা বড় ফাঁকিবাজ তাই খায়রুন নাহারকে সবদিকে নজর দিতে হয়। পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখা সালাউদ্দিনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
সন্ধ্যে নামলেই ঘরে ঘরে কুপিবাতি। ধীর পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে উঠোনের এক কোনে সাদা কাপড় গায়ে চাপিয়ে ভূতের ভয় দেখানোর সেকি নিরন্তন প্রচেষ্টা তাঁর। একবার হলো কি বেড়াতে আসা খালাতো বোন সাদা কাপড় গায়ে লম্বা মতন মানুষ দেখে জায়গায় ফিট। পরের তিনদিন জ্বরে কাবু হয়ে প্রলাপ বকতে থাকলো সেই খালাতো বোন। যদিও একবারে শৈশবটা বাবার চাকরির সুবাদে কোলকাতায়।
এমনই চলছিলো জীবন। মফস্বলের নামকরা স্কুল তখন ফেনী পাইলট হাইস্কুল। গোটা জেলা তো বটেই কুমিল্লা বোর্ডে ফলাফলে প্রথম দিকে দখল। কিন্তু ততদিনে তাঁর দুষ্টুমি বেড়েছে শতগুনে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া পেরোনোর আগেই দুষ্টুমির চোটে লাহোরে পাঠাতে বাধ্য হলেন বাবা। এবার লাহোরের দয়াল সিং কলেজ। কলেজের মেধা তালিকায় প্রথম দিকেই তাঁর অবস্থান। গোটা কলেজে মোটে মিলে বাঙ্গালী চারজন। উর্দুটা প্রথম প্রথম বেশ খিটখিটে লাগতো, কিন্তু কদিন বাদে বেশ রপ্ত হয়ে গেলো। ক্লাসের ছাত্রদের উপর ভীষণ প্রভাব। তাঁর জন্য সবাই সব করতে রাজি। এমনই মুগ্ধ করার ক্ষমতা।
১৯৬৬ সালে ফ্লাইট ক্যাডেট হিসেব যোগ দেন পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে। বন্ধুদের আড্ডার প্রাণ সালাউদ্দিন। একজন যদি বলে চা চলবে, তাঁর প্রতিউত্তর কেন কফি খাওয়া নিষেধ। একবার বাড়ি এলে আর ফিরে যেতে মনে চায়না। যাওয়ার বেলায় মায়ের সেকি আকুতি। বাক্স পেটারা ভর্তি, চিঁড়ে আর মোয়া। ছেলে কবে ছুটি পায়। আর যেদিন ছুটিতে দেশে আসা হয় এক সপ্তাহ আগে থেকে মায়ের সেকি প্রস্তুতি। ছেলে আসবে, প্রাণের ছেলে প্রিয় ছেলে।
এভাবেই চলে এলো ৭১। দিনের পর দিন অসহ্য লাগছে মাতৃভূমি ছেড়ে। গোটা দেশে তখন তুমুল যুদ্ধ। বাড়ি থেকে নেই কোন খবর। মা বাবা বেঁচে আছে না মরে গেছে কে জানে। রাত্রির ঘুম দুচোখের পাতায় একত্র হয়না। ঘুমের মাঝেই প্রলাপ বকে সালাউদ্দিন। মা ও মা। কতদিন তোমার কাছে ঘুমাই না। খানিক বাদে ঘুম ভাঙ্গে। সঙ্গীরা তখন অতল ঘুমে।
১ জুলাইতে সহ যোদ্ধা বাঙ্গালী জাহাঙ্গীর, মহিউদ্দিন,শাহরিয়ার আর আনাম সিদ্ধান্ত নেন পালানোর কেউ যেন জানতে না পারে। জানলেই সোজা ফায়ারিং স্কোয়াডে। একপাশে প্রিয় মাতৃভূমির প্রতি অবিনশ্বর টান আর অন্যদিকে প্রাণের মায়া। তাঁর দুদিন পরে ক্যান্টনমেন্টে উঁচু প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে পালানেন পাঁচজন। ৩ জুলাই শিয়ালকোটের মারালা সীমান্তের খরোস্রোতা মুনাওয়ার তাবী নদী অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেন। তাঁদের এই আগমন ঝড় তুললো গণমাধ্যমে। শিরোনাম পাকিস্তানের দুর্ভেদ্য ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে পালিয়েছে পাঁচ বাঙ্গালী অফিসার। ।
পাঁচজনই কোলকাতা গিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার এর আনুগত্য স্বীকার করে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সালাউদ্দিনকে পাঠানো হয় ১১ নং সেক্টরের প্রথম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তেলঢালা ক্যাম্পে এই রেজিমেন্টের অধীনে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং চলছিল। এখানে পরে জেড ফোর্স গঠিত হলে তাঁকে এই ফোর্সে নিযুক্ত করা হয়..ট্রেনিং শেষ হলে জেড ফোর্সের কমান্ডার মেজর জিয়া প্রথম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মাধ্যমে কামালপুর বিওপি আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। সালাহউদ্দিনকে “চার্লি” কোম্পানীর কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজ ও লে. মান্নানকে কামালপুর পাকিস্তানি অবস্থান রেকি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন ও লে. মান্নান রেকি করার সময় দুজন পাকিস্তানি সেনার সম্মুখে পড়ে। একজন পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে সালাহউদ্দিনের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। লে. মান্নান একটি গাছের নিচে অবস্থান নিলেন। সুবেদার হাই রাইফেলের বাঁট দিয়ে আঘাত করে পাকিস্তানি সেনার রাইফেল কেড়ে নিলেন।নায়েক শফি পলায়নপর পাকিস্তানি সেনাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করল। পাকিস্তানি সেনার বাংকার থেকেও গুলি বর্ষিত হলো।
সুবেদার হাই শত্রুর অবস্থান লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করতে করতে ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিনের দিকে অগ্রসর হলো। হাই সালাহউদ্দিনের বুকের ওপরে চড়ে থাকা পাকিস্তানি সেনাকে স্টেনগান দিয়ে আঘাত করলে পাকিস্তানি সেনা তার রাইফেল ফেলেই পালিয়ে যায়। সালাহউদ্দিন ও মান্নান শত্রুর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া রাইফেল দুটিসহ অন্যদের নিয়ে নিজ অবস্থানে ফিরে আসেন। সেদিন অল্পের জন্য এভাবেই প্রাণে বেঁচে গেল।”
৩০-৩১শে জুলাই প্রথম ইস্ট বেঙ্গল (সিনিয়র টাইগার) রাতের আঁধারে রওনা হলো। প্রথমে সালাহউদ্দিনের ডেল্টা কোম্পানী, ফলোআপ কোম্পানী হলো ক্যাপ্টেন হাফিজের ব্রেভো, যার পিছনে হল ব্যাটালিয়ন ‘আর’ গ্রুপ এবং এই ‘আর’ গ্রুপে ছিলেন মেজর (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) মঈন এবং সাথে ছিলেন কর্নেল জিয়াউর রহমান।
মুক্তিবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি সেনারা তাদের প্রথম সারির প্রতিরক্ষা অবস্থান ছেড়ে পেছনে সরে যায়। মুক্তিবাহিনীর সাহসী সৈনিকরা শত্রুর বাংকার অতিক্রম করে কমিউনিটি সেন্টারে ঢুকে পড়ে এবং হাতাহাতি যুদ্ধ শুরু হয়। সুবেদার হাই এর নেতৃত্বে যে প্লাটুনটি যুদ্ধ করছিল তারা মাইন ফিল্ডের সামনে পড়ে যায়। এই প্লাটুনের ডানে ছিলেন ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন ও তার সহযোগীগণ।
পাকিস্তানি সেনারা তখন পাল্টা আক্রমণের জন্যে তৈরি হচ্ছে। সালাহউদ্দিন সুবেদার হাইকে ডানে যেতে নির্দেশ দিলেন। নায়েক হাই এর হাত বোমার আঘাতে উড়ে গেল। দুজন ধরাধরি করে তাঁকে সরিয়ে নিলো। কিন্তু সালাহউদ্দিন তখন পলায়নপর পাকিস্তানি সেনাদের পেছনে ধাবমান। পিছন থেকে ডেল্টা কোম্পানি সহযোদ্ধাদের চিৎকার “স্যার সরে আসুন “! কিন্তু তিনি অনড়। বলছেন “আমার কথা ভেবোনা, সরে যাও তোমরা। সামাল দিচ্ছি আমি”। সরে যাও, ওরা পালাচ্ছে। ক্ষতির সম্ভাবনা প্রবল।
যাও যাও, প্রচণ্ড গর্জনে বলছেন তিনি। সঙ্গীদের সরিয়ে দিয়ে একাই লড়ে গেলেন পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে। আর সঙ্গে চিৎকার, জয় বাংলা, জয় বাংলা। একটানা চলছে মেশিন গানের অবিরাম গুলি। আর অন্যপাশে পিছু হটছে পাকিস্তান বাহিনী। খানিক বাদে শত্রুবোমা সালাহউদ্দিনের ঠিক সামনে এসে পড়লো, রক্তে রঞ্জিত হলো প্রিয় মাতৃভূমি। তখনো সালাউদ্দিনের একটানা চিৎকার। জয় বাংলা, জয় বাংলা।
লিখেছেন :Ahmad Istiak

Leave a Reply