স্মৃতি যখন শ্রদ্ধেয় ওহাব স্যার !!

শ্রদ্ধেয় স্যার কে মরহুম বলতে রাজি নই।
উনি আজো আমাদের সামনেই বেঁচে আছেন, উনাকে আমরা হৃদয়ে ধারন করে রেখেছি, রাখবো।
সময়টা স্বাভাবিকভাবেই ১৯৯৫ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত। যেহেতু ২০০০ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিবো, ওই সময়টা আমরা বাসা এবং প্রাইভেটে পড়াশুনা নিয়েই ব্যস্ত। তাই আজকে ৯৫-৯৯ সাল পর্যন্ত কিছু মধুর এবং তিতার অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করবো।

স্যার বরাবরই জুনিয়র ক্লাসের এইট থেকেই ক্লাস নিতেন। আমাদের সময়ে যতটুকু মনে পড়ে আমরা ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে পড়া অবস্থায় স্যারের তেমন ক্লাস পাইনি, পেলেও সেগুলো বদলি শিক্ষক হিসেবে কালে ভদ্রে ক্লাস নিতেন। তখনকার ওহাব স্যার ছিলেন একদম যুবক বয়সের। অনেকটা আমরা এখন যে বয়সে উপনীত হয়েছি। স্যারের বাচনভঙ্গি, কথাবার্তা উনার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অপরিবর্তনীয় ছিলো যা আমাদের জুনিয়রদের কাছ থেকে জানতে পারি।

স্যার আমাদের ক্লাস নেয়া আরম্ভ করেছিলেন ক্লাস এইটে থাকতেই। বাংলা বিষয় নিয়ে। বাংলা ব্যাকরণের ক্লাসগুলো আমরা বাদ দিতে পারতাম না। কেননা, স্যার এটার জন্যেও কড়াকড়িতে রাখতেন সাংঘাতিক ভাবে। স্যারের বাংলা দ্বিতীয় পত্রে কেউ পাশ করলে তার খবর আছে 😀😂 !! মজা করছি না, সত্যি। জুনিয়র ভাইরা তোমরা হয়তো ভাবছো “বাপের জন্মেও শুনি নি, কোনো শিক্ষক তার বিষয়ে পরীক্ষা নিলে সেই বিষয়ে কেউ পাশ করলে তার খবর আছে 🤔 !! বড় ভাই কি কিছু খাইসে নাকি 😁 !! ”

হাহাহাহাহা হ্যাঁ, ব্যাপারটা সত্যি। স্যারের বাংলা ব্যাকরণে কেউ নৈব্যত্যিকে ৩০ এর উপর পেলে তার খবর ছিলো !! ব্যাপারটা মজার না 😏 ?
যাইহোক, আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট-সেকেন্ড-থার্ড বয় এরা তো ৩০-৪০ এর উপর মার্ক পেতোই, এবং অন্যান্য সহপাঠিরাও যারা প্রথম ১৫ জনের প্লেজে থাকতো, তারাও ৩০ এর বেশি পেতো কালে ভদ্রে। কিন্তু আমরা যারা বেক ব্যাঞ্চারস ছিলাম, তাদের পক্ষে ৩০ মার্কের বেশি পাওয়া মানে বাংলা সাহিত্যে পাণ্ডিত্য অর্জন করার শামিল 🤓 !! যাইহোক, আমি সেখানে বোমা ফাটিয়ে দিলাম 😎 !!

কিভাবে !!? ওইযে, নৈব্যত্যিক এ যে ৫০ মার্কের প্রশ্ন হতো, আমি সিরিয়ালি মনে কর যে
প্রশ্ন নাম্বার ১ এর ক, প্রশ্ন নাম্বার ২ এর খ, প্রশ্ন নাম্বার তিন এর গ, প্রশ্ন নাম্বার ৪ এর ঘ। এভাবেই পর্যায়েক্রমিকভাবে রিপিট করতাম। মাঝে মাঝে হয়তো এটা ওটা আগে পরে কালো কালিতে বৃত্ত ভরাট করতাম। আর নিজে তো যেহেতু কিছু জানি সেগুলো তো ভরাট করতামই, এরপর আবার সেই আগের মত। এভাবে যখন পরীক্ষা দেয়া শেষ হলো তখন রেজাল্টের আগে স্যার একদিন ক্লাসে আসলেন সবার খাতাগুলা দেখানোর জন্যে। এমনে করেই আমার খাতা দেখানোর সময় হলো। আমার রোল এবং নাম ধরে ডাক দিলেন। এখানে একটা কথা বলে রাখি, আমি টুকটাক কবিতা লেখার চর্চা করার কারনে স্যার আমাকে “কবিয়াল” বলে ডাকতেন। যদিও আমি সেই রকম মাপের/মানের কবিতা লিখিনা, এখনো অনেক বছর না লিখতে লিখতে মনের চিন্তাগুলোর মাঝে অনেকটা জং ধরে গেছে। যাইহোক, আসল কথায় আসি, তো শ্রদ্ধেয় ওহাব স্যার আমাকে ডাকলেন “কবিয়াল তুই কিভাবে এতো নাম্বার পেলি, এটা তো অবিশ্বাস্য !!”

আমি হেঁসে বললাম “স্যার কেমনে কমু এতো নাম্বার কেমনে পাইসি 😬 !!” এটা বলে শেষ করি নাই, অমনি স্যারের সেই শৈল্পিক মাইর শুরু, যারে তোমরা উরাধুরা মাইর বলো 😀। আমি হাসি আর কইতে থাকি “ও স্যার, আঁই কিচ্ছি, আঁই কি হাশ করি ন !!? ” স্যার ও দাঁতে দাঁত চেপে বলছিলেন, “হাশ কইচ্ছত ত, তয় যেমনে ক্যাংগারুর মতন লাফাই লাফাই আন্দাজে উত্তর দিয়া ৩২ মার্ক পাইলি এমনে তো চিন্তা করি নাই 😱 !!

“তরে এই টেকনিক কনে হিঁকাইসে অন ক”!! আমি যতই বলি, “স্যার আঁই ত জানি উত্তর দিসি, যেগেন হারি ন, হেগেন চোখ বন্ধ করি মারি দিসি” !! এটা বলাতে উনি উনার সেই বিখ্যাত স্টাইলে দুহাত মাঝে বেত রেখে ডানে বামে তাকিয়ে সবাইকে বললেন “দেইখসতনি তোরা, এতে এগেন কিয়া কয়, হেতে বলে চোখ বন্ধ করি মারি দিসে” এটা বলে আবারো মাইর। তারপর উনি উনার আসনে ফিরে গিয়ে সেই মাথা নিচু করে চোখ জোড়া উপরে তুলে আবারো সেই বিখ্যাত মুচকি হাসি দিয়ে বললেন “পরীক্ষার শেষ সময়ে এই টেকনিক ফলো করলে তো ফেল করবি, এটা তো টিউটোরিয়াল পরীক্ষা। বোর্ডের পরীক্ষায় এই কাজ ভুলেও করবেনা। পাশ মার্ক আগে নিশ্চিত করে তারপর অন্যগুলার উত্তর দিবে। স্যারের সেই চাপা ভাষায় উপদেশটা আজো মনে স্থায়ীভাবে গেঁথে আছে। তাই কথাগুলো সাবলীলভাবে প্রকাশ করলাম 🙄😐 !!

স্কুলে জুনিয়র স্কাউট করার কারনে বছরের মার্চ আর ডিসেম্বর মাস আসলে আমাদের কুচকাওয়াজ অনুশীলন অনেক বেড়ে যেতো তখন। এমনি করেই একদিন স্কুলের সাথে যে মসজিদটা আছে সেটার সামনের পাকা রাস্তায় মার্চ করছিলাম কয়েকজন সহ। দূর থেকে স্যার কে দেখে আমরা আমাদের মার্চ করার তালগোল পাকিয়ে ফেললাম। স্যার কাছে এসে কমান্ড দিলেন “দল দুই সারিতে সামনের দিকে জলদি এগিয়ে চলবে”, কিছুদূর যাওয়ার পর আবার কমান্ড দিলেন “উল্টা ঘুর”, এরপর উল্টা ঘুরে আবার সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে যখন স্যারের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন কমান্ড দিয়ে বললেন “এবার থাম” !!
সেদিন মনে হলো আমাদের সিনিয়র লিডারদের কমান্ডের চেয়ে স্যারের কমান্ডই বেশি কার্যকর। এরপর হঠাৎ করে কৌতুহল হয়ে স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা স্যার আপনি ও কি স্কাউট করতেন !!? ”

স্যার হেঁসে উত্তর দিলেন “হ্যাঁ, স্কাউটিং ও করেছি, কলেজ লাইফে বিএনসিসিতেও ছিলাম, সেই জন্যে এই ধরনের কমান্ড হরহামেশা নিজের ক্যাডেটদের উপর এপ্লাই করতাম, সেই সাথে জুনিয়রদের ও” !!

সেদিনের ওইটুকু বয়সে কি বুঝলাম জানি না, তবে আজকে স্যারের শূন্যতা অনুভব করে বুঝতে পারছি, আমরা আসলেই অসাধারণ এক লিজেন্ডকে হারিয়েছি। স্যারের তুলনা স্যার নিজেই। উনার সাথে অন্য শিক্ষকদের তুলনা করার দুঃসাহস, স্পর্ধা আমার নেই। তিনি সততার সাথে তার সমৃদ্ধ জ্ঞানের সম্ভার তার গোটা শিক্ষকতা জীবনে শুধু আমাদের ছাত্রদের মাঝে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন নিঃস্বার্থ ভাবে। আমরা সেটা দেখেছি। শ্রদ্ধেয় ওহাব স্যার খুবই সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। সেই স্কুল জীবন থেকেই উনাকে দেখতাম কোথাও তিনি যাচ্ছেন, হেঁটে হেঁটেই যাচ্ছেন। হাতে কোনো সময় হয়তো কচি ডাব থাকতো, নয়তো দুয়েক পদের সবজিতে ভরা বাজারের ছোট একটা কাপড়/পলি ব্যাগ। এমন কি গত বছর আজকের মত এমনই একটা কাঠ ফাটা দুপুরের রোদে আমাদের মিজান রোডের আলিয়া মাদ্রাসার কোণায় একটা চায়ের টং ঘরের নিচে ছায়ায় দাঁড়িয়ে উনি বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। স্যারের মুখটা খুবই বিমর্ষ দেখাচ্ছিলো। প্রচন্ড গরমে চারদিকে কোনো রিকশা দেখা যাচ্ছিলো না। আমিও স্থান ছাড়তে চাইছিলাম না, আবার ভয়ে কিছু জিজ্ঞেস ও করার সাহস পাচ্ছিলাম না। এক পর্যায়ে ভয়ে ভয়ে কাছে গিয়ে সালাম দিলাম “আসসালামু আলাইকুম স্যার, কেমন আছেন স্যার ? আমাকে চিনতে পেরেছেন !!?”

স্যার হেঁসে উত্তর দিলেন “আরে আরে কি যেন নাম, কি যেন নাম এটা বলে নিজের ভ্রু চুলকাতে লাগলেন, এরপর বললেন, কিছু মনে করো না বাবা, তুমি আমার ২০০০ ব্যাচের ছাত্র ছিলা” এটা বলে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এরপর নিজের পরিচয় দিলাম নামসহ এবং টুকটাক অনেক কথাও হলো। ভাবা যায়, দীর্ঘ ১৯ বছরেও স্যার আমার মত অধমকে ভুলে যাননি। এটা ভাবতেই নিজের কাছে গর্ববোধ হচ্ছিলো। বাকিটা তো স্যারই বলে দিলেন। এরপর স্যারকে অনেক পিড়াপিড়ি করলাম বাসায় আসার জন্যে, স্যার হেঁসে উত্তর দিলেন “বেঁচে থাকলে সামনে আসবো ইনশা আল্লাহ” !! স্যার কথা দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু নিয়তিই তাকে কিছুদিন পর উঠিয়ে নিয়ে যায় মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে।

এটা ছাড়াও স্কুল জীবনে অসংখ্য মধুর স্মৃতি স্যারের সাথে আমাদের জড়িত আছে যেগুলো বর্ণনা করলে আজ আর লেখা শেষ হবেনা।
শ্রদ্ধেয় ওহাব স্যারকে মনের গহীন থেকেই ভালোবাসি। স্যারের স্নেহ মমতা, আদর শাসনই আজ আমাদেরকে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। আমরা স্যারকে কোনোদিন ভুলবোনা। আমাদের সম্মিলিত দোয়া সারা জীবন স্যারের জন্যে আছে, থাকবে যতদিন দুনিয়ায় আমরা সুস্থভাবে বেঁচে থাকি, ইনশা আল্লাহ।
মহান রাব্বুল আলামিন এই মানুষ গড়ার মহান কারিগরকে বেহেস্তের সর্বোচ্চ মাকামে স্থান দিন।
আমিন, সুম্মা আমিন।

লিখেছেন : Md. Nehal Uddin

Leave a Reply

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>